March 05, 2023

প্রবুদ্ধদাকে যেমন দেখেছি


সম্ভবত ২০১২
। সবে ঈশানকোণের কবিতার স্বাদ নেওয়া শুরু করেছি আর বিস্মিত হচ্ছি। এমন সময় হাতে এলো এক ক্ষুদ্র কবিতা :

‘বাবা, বেগবান অশ্ব  

মা, উদ্ভট সংসারের ভারবাহী গাধা

আমি খচ্চর, বাংলা কবিতা লিখি।’

        এই তিন লাইন আমাকে এনে দিয়েছিলো বিস্ময়। এভাবে কেন কোনদিন ভাবিনি আমি? ইচ্ছে হলো, মানুষটাকে জানার যে নিজেকে অকপটে 'খচ্চর' বলে ঘোষণা করতে পারে। কবির নামটাও কবিতাটির মতই বড় অন্যরকম, একবার শুনলে মনে থাকতে বাধ্য – প্রবুদ্ধসুন্দর কর। এর পর কিছুদিন কাটলো আমার প্রবুদ্ধসুন্দর করের কবিতার খোঁজে। যত পড়ছি তত আরও মুগ্ধতা বাড়ছে, রীতিমতো ভক্ত হয়ে পড়েছি  ওই কাব্য কথার। এবং এই ভালোলাগা এখনও একই ভাবে আঘাত করে, যতবার প্রবুদ্ধসুন্দর করের কবিতার বই হাতে তুলি, এমনই শব্দের জাদু।


        তখন কবিমহলে আমার পরিচিতি হাতে গোনা কয়েকজন। কিন্তু তাঁদের সবাইকে বলেছিলাম এই কবিকে বড় দেখতে ইচ্ছে হয়, কী করে উনি এমন কথা লিখে ফেলেন বড় জানতে ইচ্ছে হয়। এবং আমার সৌভাগ্য যে একদিন এক পরিচিতের মাধ্যমে আমি ফোনে কথা বলে ফেললাম, ছুঁয়ে ফেললাম কবিকে। মনে আছে প্রথম দিন ফোনেই ওনাকে বলেছিলাম 'আমি আপনার লেখা পড়ে আপনার সাথে কথা না-বলে থাকতে পারলাম না।' তিনি জোরে হেসে উঠেছিলেন। সেই আমাদের পরিচিতি, তার পর ১০ বছরে প্রবুদ্ধদা কখন যে এত কাছের মানুষ হয়ে গেলেন, জানি না।


        প্রবুদ্ধদার কবিতার সম্পর্কে জ্ঞান ও তার ব্যাপ্তি যে কি সুবিশাল ও সুগভীর, কথা না বললে ভাবা যায় না। কতদিন যে কত নামী-অনামী-বেনামী কবির কবিতা মেসেঞ্জারে পড়িয়েছেন, তার হিসেব নেই। বইয়ের নাম পাঠিয়ে বলেছেন, কিনে ফেলো। প্রবুদ্ধদার কাছে ছিল এক ঈর্ষণীয় মেমোরি পাওয়ার। বহু পুরোনো কথা মনে রাখতে পারতেন।গত বছর দারুহরিদ্রার ব্লগে তখন নিয়মিত তাঁর ধারাবাহিক আত্মজীবনী গদ্য ‘নীল উপত্যকার রাখাল’ প্রকাশ হচ্ছে। প্রকাশ হলে উনি লিংক পাঠিয়ে দিতেন। মনে আছে কিছু কিছু অংশ (খুব সম্ভব একটি মেলার বিবরণ)  পড়ে তাঁকে বললাম, 'আপনি এতো ডিটেল মনে রেখেছেন? সত্যি মিথ্যে মিশিয়ে উপাদেয় করছেন, তাই না?' তিনি হাসলেন, বললেন, 'তোমার সাথে প্রথম দেখা হওয়া অনেক বছর হয়ে গেছে, আমি আজ ও বলতে পারবো আমরা সেদিন ঠিক কি কথা বলেছিলাম।' এরপর মনে হলো সত্যি তো এই কথাই তো হয়েছিল। বললেন- 'কি?পরীক্ষায় পাশ তো?'


        আরেকটা কথা মনে পড়ে গেলো, কবি প্রবুদ্ধসুন্দর করের গানের প্রতি ভালোবাসা। প্রচুর ভালো ভালো গান সোসাল মিডিয়ায় শেয়ার করতেন। তিনি প্রথম আমায় জানিয়েছিলেন যে কমলিকা দিয়েও গান আছে। এর আগে আমি অখিলবন্ধু ঘোষের ‘তোমার ভুবনে ফুলের মেলা’ গানটা শুনিনি। তাঁকে এই কথা বলার পর তিনি যেখানে যত রকম এই গানটির ভার্সন পেতেন, আমাকে ট্যাগ করে দিতেন। বলতেন যখন শোনোনি, বেশি শুনিয়ে ব্যালান্স করে দিচ্ছি- তিনি ছিলেন ঠিক এমনই উইটি।


        আসলে যখন এমন প্রাণোজ্জ্বল মানুষ হুট করে চলে যায়, কেমন যেন মন খারাপের মেঘ ঘিরে ধরে। এমন স্মৃতিকণাগুলোই তখন হয়ে ওঠে মেঘলা দিনের সঙ্গী। পরিচয়ের প্রথম দিন থেকেই জানি প্রবুদ্ধদা অসুস্থ, কারণ সেটা তাঁর মুখ থেকেই শুনেছিলাম। অথচ তাঁর কথায়, কর্মে বা কবিতায় সে ছাপ পরেনি কখনও। তাই মন বিশ্বাস করতো তিনি ঠিক আছেন, যখন হায়দ্রাবাদ গেলেন তখন ও মন বলত সব ঠিক হয়ে যাবে।


       স্মৃতিকথা লিখতে বসে কবি প্রবুদ্ধসুন্দর কর নিয়ে না-লিখে এতক্ষণ শুধু প্রবুদ্ধদা নিয়েই লিখে গেছি। আসলে, এমন শক্তিশালী যাঁর লেখন-ভঙ্গিমা, তাঁর লেখা নিয়ে কিছু লেখার দরকার পড়ে না। প্রবুদ্ধদার কবিতার বই শুধু হাতে তুলে নিতে হয় আর পাঠ করতে হয়,  নিজে নিজে, একান্তে। এবং প্রতিবার শব্দগুলো গিয়ে আঘাত করে গ্রে-সেলগুলোতে, এমনই তার জাদু। কবিতা নিজে নিজেই মুখস্ত হয়ে যায়, বলা ভালো আত্মস্থ হয়ে যায়।


           এমন স্মার্ট, সময়োচিত ও দৃঢ় শব্দ প্রয়োগ খুব কম কবি আয়ত্তে আনতে পারেন আর তাঁর ক্ষেত্রে ওইটাই ন্যাচারাল। তাই তো পাঠক নিজে থেকেই খুঁজে নিয়েছে প্রবুদ্ধদার কবিতা। তাই হারানোর পর এতো হাহাকার। তাই, কবি প্রবুদ্ধসুন্দর থেকে যাবেন এই শব্দগুলোর মধ্যে আমাদের, অন্তরের গহীনে। বইয়ের পাতা ছুঁলেই মন বলে উঠবে বারবার 

‘পৃথিবীতে এত ছল

যে কোনো ছুতোয়, প্রবুদ্ধসুন্দর চলে এসো।’  


গুয়াহাটির 'একা এবং কয়েকজন' পত্রিকায় প্রকাশিত (৪৩ বর্ষ, কবিতা সংখ্যা, নভেম্বর ২০২২)

May 30, 2021

স্বীকার-অস্বীকারের কাব্যকথা

@কমলিকা 

 

‘কনফেশন’ বা স্বীকারক্তি কথাটা মাথায় এলেই চোখে প্রথম ভেসে ওঠে গির্জার ভেতর বন্ধ ঘরে বসা এক মানুষ। তিনি মন ও মগজের সকল দ্বন্দ -দ্বিধা এক করে বলে চলেছেন অকপটে সকল সত্য কথা। মেলে ধরছেন সব অপরাধ বোধ যতনে এক এক করে। বন্ধ ঘরের  লাগোয়া  ঘরে সে কথা বসে একমনে শুনে চলেছেন এক পাদ্রী। শ্বেত শুভ্র বসন,হতে ক্রস ও রোজারি। সকল কথার পর পাদ্রী সাহেব যীশুর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা ভিক্ষা করেন। ওপারের অচেনা মানুষটিকে আদেশ করেন ভবিষ্যত কলুসমুক্ত রাখতে। এর পর যে যার কাজে বেড়িয়ে যায়। ব্যস ,এই টুকুনই গল্প।

এ দৃশ্য যতবার ফিল্মের পর্দা অথবা বইয়ে উঠে এসেছে,ততবার ভেবেছি – বাহ্, কি সহজ সরল উপায় মনের ভাব লাঘব করার। কোন থানা-পুলিশ, লোক-লজ্জা কিছুই নেই। তবে এই দৃশ্যটি আগের দিনেই দেখা যেত। আজকাল কনফেশন বক্সের কথা প্রায়ে চোখেই পরে না। হয়তো মানুষ এখন নিজের মনের কথা নিজেকেই স্বীকার করতে ভয় পায়। নিজের সৃষ্ট তোরঙ্গে তাই তলাচবী দিয়ে রাখে সকল দুঃখ, হতাশা, পাপবোধ।

সেই বক্সের অকপট স্বীকারক্তির সুত্র থেকেই আমেরিকায় ১৯৫০ এবং ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে এক ধরনের কবিতার চল হয়, যার নাম কনফেশনাল পোয়েট্রি বা কনফেশনালিসম্। বিখ্যাত কবি রবার্ট লয়েল, সিলভীয়া প্ল্যাথ , এনি সেক্সটন, জন বেরীমোর, এবং অন্যান্য সেই সময় লিখে গেছেন একেরপর এক সব অসাধারণ কনফেশনাল পোয়েট্রি।  সিলভীয়া প্ল্যাথের বিখ্যাত কবিতা ‘ড্যাডি’ কনফেশনাল পোয়েট্রির এক জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ।

‘… If I’ve killed one man, I’ve killed two –

The vampire who said he was you

And drank my blood for a year,

Seven years, if you want to know

Daddy, you can lie back now …’

 

এ কবিতার প্রতিশব্দে তাঁর অকাল পিতৃবিয়োগ, পিতার প্রতি ঘৃণা ও তার পরবর্তী বিভীষিকাময় জীবন ফুটে ওঠে।

কনফেশনাল পোয়েট্রিকে বলা হয় আমি-র কবিতা। এখানে কবি নিজেকে ও নিজের হতাশা, উপলব্ধি, দুর্ভোগ আঁকে শব্দ তুলির ছোঁয়ায়। তবে এই লুকানো  দরজার কথাগুলোর মধ্যে কিন্তু কবি তার চতুরতার ও বাগ্মিতার পরিচয় রেখে সাজিয়ে যায় এক অক্ষরের মায়াজাল, কবির একেবারে নিজের মনের কথা তাই হয়ে উঠে পাঠকের মনের গভীর সংকেত।  

যে স্টাইলটি বিদেশ একসময় নাড়িয়ে দেয়, অবাক ভাবে ভারতে তার তেমন ছায়া নেই বললেই চলে। একমাত্র কবি কমলা  দাস  কে বাদ দিলে আর কোনো কবিকেই আলাদা ভাবে কনফেশন পোয়েট আমরা পাইনি। কোমল দাসের ‘গ্লাস’ কবিতা তার জীবনে বিভিন্ন পরকীয়া সম্পর্কের ইঙ্গিত বহন করে –

… I enter others

Lives, and

Make of every trap of lust

A temporary home.’

 

সে ভাবে দেখতে গেলে বাংলা ভাষায় কনফেশনাল পোয়েট্রি আলাদা কোনো জায়গা করতে পারে নি, তবে এই কথাও অস্বীকার করা যায় না – রাতের সব তারাই আছে দিনের আলোর গভীরে। কবিতায় কবি তার সত্তা মিশিয়ে দেয় নিজের অজান্তেই।  তাই, কখনো কখনো সেখানে ধরে পড়ে মনের গভীরে লুকিয়ে থাক কথা। যেমন কাজী নজরুল লিখেছেন তার সর্বহারা জীবন নিয়ে –

‘ ...বিশ্বাস করুন আমি কবি হতে আসিনি, আমি নেতা হতে আসিনি, আমি প্রেম দিতে এসেছিলাম,প্রেম পেতে এসেছিলাম। সেই প্রেম পেলাম না বলে আমি এই প্রেমহীন নিরস পৃথিবী থেকে নিরব অভিমানে চিরদিনের জন্য বিদায় নিলাম।...’(যদি বাঁশি আর না বাজে)

উত্তরপূর্বের কাব্যভুবনে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে দেশহীনের যন্ত্রনা। নিজের বাসভূমিতে জারজ অস্তিতের কথা ফুটে ওঠে বহু কলমে। কিন্তু সেই কবিতগুলোয় সার্বজনীন দুঃখ পরিলক্ষিত হয়, অথবা কোনো কাল্পনিক (আদৌ কাল্পনিক নয়) রূপকের মাধ্যমে প্রকাশ পায়।

এই দুঃখের জয়গাটাতেই আমরা কনফেশনাল পোয়েট্রির হাত ধরতে পারি। নিজেদের অভিজ্ঞতা, চাওয়া-পাওয়ার ফারাক, স্বপ্ন ও বাস্তব জগত কে এক করে লিখতে পারি ‘ আমি- র’ কবিতা,  ‘আমার’ কবিতা, ‘আমাদের’কবিতা। কিছু দিন আগে মিয়া কবিতার বহুল প্রচার সে দিকেই ইঙ্গিত দিয়েছিল, কিন্তু ইঙ্গিত আর বাস্তবায়িত হয় নি। এখন সময় শুধু অপেক্ষার।

 কনফেশনাল পোয়েট্রি কোথাও কোথাও নিন্দিত হয়েছে ‘নারসসিসম’-এর দায়। নিজের প্রতি অতিরিক্ত ভালোবাসা ও বাকি সকলকে উপেক্ষা করা- এই বিষয়টি সমাজ সে ভাবে মেনে নিতে পারেনি। আর তাই হয়তো এর আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে কোনো এক গোপন চেম্বারে থেকে গেছে এক নিস্তব্ধ প্রদীপ হয়ে। হয়তো ভবিষ্যতের কোনো এক পথিক এসে এর সলতে একটু উসকে  দিয়ে যাবে, আমরা থাকবো সেই প্রতীক্ষায়।


প্রকাশিত হয় অন্তঃকরণ পত্রিকার ৬ষ্ঠ সংখ্যায়, ফেব্রুয়ারী ২০২১ (আগরতলা, ত্রিপুরা)

May 25, 2020

কবিতা কেন লিখি?

@কমলিকা 


কবিতার এই যে রহস্যময় জগৎ - এটাই তার ইউ. এস. পি। এই মায়াবী পরিবেশ বেশি ভাবায় ও আকর্ষণ করে। এক অমোঘ টান বার বার নিয়ে আসে এই শব্দের খেলা ঘরে। আসলে এ যেন এক অন্য পৃথিবী- ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি। এই গলিপথে ভ্রমণ করা যায় খেয়াল খুশি মত,অথচ সম্পূর্ণ বন্ধনহীন ও নয়। নিয়ম বানানো, নিয়ম মানা  আবার নিয়ম ভাঙ্গা – সবটাই নিজের হাতের মুঠোয়। বাস্তব ও রূপকথা সেখানে মিলে মিশে এক হয়ে যায়। মনে হয় যেন শব্দ তুলি দিয়ে ক্যানভাস জুড়ে আঁকছি একের পর এক পটছবি, ঢেলে দিয়ে যাচ্ছি সব রঙ- সুখ, দুঃখ, আনন্দ, হতাশা।

কবিতার কাছে নিজেকে মেলে ধরা যায়। কবিতা আসলে হল ভাষার ওয়েসিস। এতে ডুব দেওয়া যায় জীবনের কঠিন বাস্তবের তপ্ত বালুর প্রকোপ থেকে বাঁচতে। ধরা যাক একটা স্বপ্ন এই মাত্র ভেঙে গেল, অথবা এইমাত্র একটা স্বপ্ন পূরণ হল। ব্যস,  মনে নেমে এল এক ঝাঁক আবেগ ও উচ্ছাস। এই মুহূর্তর সেই স্পার্কটা ধীরে ধীরে সময়ের পড়তে কিন্তু হারিয়ে যাবে। কিন্তু একে যদি একবার নিজের মনের কথা  মিশিয়ে লিখে রাখা যায়, সে কিন্তু থেকে যায় তার সেই মুহূর্তর সত্যতা নিয়ে। অনেক বছর পর ও সেই শব্দেরা ফিরিয়ে নিয়ে যাবে সেই আবেগের কাছে। এটা অনেকটা ঝিনুক যেমন বালি থেকে মুক্ত বানিয়ে রাখে।  না বানালে দোষের কিছু নেই,কিন্তু বানালে পরবর্তী সময় কোথাও সেটা থেকেই যায়। তবে অমরত্বের লোভ নয়, শুধু মনের মধ্যে তৈরি হওয়া মুহূর্তগুলোকে একটু কাছে রাখতে কবিতার হাত ধরেছি। ভাললাগে মনের কথাগুলোকে বেশ পরিপাটি করে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখতে ফটো এলবামের মত । মাঝে মাঝে হাতে নিয়ে হারিয়ে যাওয়ার মজাই যে আলাদা।

কোথাও সব মানুষের মনের একটা শিরা হয়তো এক রকম । তাই অন্য কবির লেখা কোন কবিতা মনে হয় যেন আমার কথা বলে। আশায়  থাকি আমার শব্দেও হয়তো কেউ খুজে পায় নিজের হারানো কিছু অনুভব। এই মনের সাথে মনের রিফু সেলাই করতে হাত বাড়াই কবিতার দিকে। জানি কবিতাকে ভালবেসে তার কাছে গেলে কবিতা নিরাশ করে না।


প্রকাশিত ‘দৈনিক বজ্রকন্ঠ’ ব্লগ-পত্রিকায় ২৬.০৩.২০২০(আগরতলা, ত্রিপুরা)


ছায়াশরীর

@কমলিকা 

এ লেখার শুরুতেই অনেকটা ফিল্মি কায়দায় বলা ভালো যে কবিতার সঠিক মানে বোঝা ও বোঝানো "মুশকিল হি নহি, না মুমকিন হে"। কবিতা কোনো পরীক্ষার খাতায় লেখা কুড়ি মার্কের রচনা না যে পাতা ভরে লিখে ভূমিকা, মূলকথা ও উপসংহার ভাগ করে দিলেই কাজ চলবে।তা চেষ্টা করাও বোকামি মাত্র। নানা মুনির নানা মত প্রবাদের মতো কবিতা কি এবং কেন এই নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সংজ্ঞা নির্মাণের চেষ্টা হয়েছে এবং বলা ভালো যদিও আপাত দৃষ্টিতে দেখলে এই বিভিন্ন সময় ও অবস্থান বিভিন্ন মতের জন্ম দিয়েছে,সময়ের আতস কাঁচে কিন্তু সব একে অপরের পরিপূরক হয়েও দেখা দিয়েছে। এখানেই কবিতার রহস্যময়তা,কবিতার আসল ম্যাজিক। কবি কার্ল স্যান্ডবার্গ বলেছেন ,"কবিতা হলো এক প্রতিধ্বনি, এক ছায়াশরীরকে নাচতে বলার আবদার।" সেই প্রতিধ্বনি ওঠে কবির গহন মনে।দিনের কাজের ফাঁকে হঠাৎ আসে সে অলীক ডাক,আর কবি তাঁর সকল বাইরের জগৎ ছেড়ে মেতে ওঠেন নির্মানকলায়।


কবিদের এই কাব্যজগত কিন্তু বেশ মায়াবী স্বপ্নময়।তাঁর চোখের মাঝে যে প্রতিবিম্ব তৈরি হয় তা সর্বসাধারণ থেকে আলাদা। এই যে আলাদা অনুভূতি,এটাই তফাত এক সাদামাটা বাক্য আর কবিতার শব্দবন্ধে। কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী একটি মজার উপমা দিয়েছেন কবিতা সম্পর্কে। উনি কবিতা রচনাকে সিংহ শিকারের সাথে তুলনা করেছেন। শিকারী খবর পেয়ে ছুটে যান সিংহ শিকারে।আদতে তিনি নিশ্চিত জানেন অব্দি না সেখানে সিংহ আছে কি নেই,থাকলে সঠিক স্থান কোথায়। অথচ শুধু শোনার উপর নির্ভর করে তিনি খুঁজে বেড়ান ও হয়তো পেয়েও যান কখনো। কবিরা তাঁদের জীবনযাপনে ঠিক এভাবেই ছুটে চলেন কবিতার খোঁজে।কেউ খুঁজে পায়,কেউ পায় না,সে অন্য গল্প;কিন্তু খোঁজটাই আসল।


কবিতা হলো কবি জীবনের ওয়েসিস।সাধারণ জীবনের নানা কাজের ফাঁকে একটু আশ্রয়স্থল।সেখানে সে একা বাসিন্দা,তাঁর দায় নেই সামাজিক বেড়াজাল রক্ষার, হাসি দেখিয়ে কান্না লুকোবার। সেখানে সে ঈশ্বরের বরপুত্র- শুভ্র, পবিত্র, শান্ত। যে জীবনে একবার এই রহস্যস্থল উদঘাটন করতে পেরেছে, বারবার সে ফিরে আসতে বাধ্য। এবং এর জন্যই হয়তো আমার কবিতা লেখা, কবিতাকে ভালোবাসা।


বাংলা কাব্যভূবনে অজস্র নক্ষত্রপুঞ্জ স্বমহিমায় বিদ্যমান।নতুন প্রজন্মের এই আমরা ভাগ্যবান যে অগ্রজরা আমাদের হাতে তুলে দিয়ে গেছেন এক বিরাট কাব্য সম্পদ। ভিন্ন দশকের ভিন্ন ফ্লেভার,ভিন্ন ধারা।এবার তাদের এই সম্পদকে সাথে নিয়ে নতুন ভাঙা গড়ার খেলায় নামটাই আমাদের কাছে সর্ববৃহৎ চ্যালেঞ্জ। সেই চির পরিচিত জীবন-মৃত্যু, প্রেম-বিরহ,শান্তি-সন্ত্রাস,সবই তো লেখা হয়ে আছে। তাই মাঝে মাঝে নিজের মনেই প্রশ্ন আসে কেন লিখবো? আসলে কবিতা হলো সেই 'বেস্ট ফ্রেন্ড ফরেভার' যাকে মন খুলে সব ভালো বা খারাপ লাগে বলা যায়।কিন্তু এই বলার কায়দাতেই লুকিয়ে আছে আসল ভানুমতির খেল। আমার যা বলার আছে বলবো, কিন্তু নতুন আঙ্গিকে।ধরা যাক,রবীন্দ্রনাথ যখন লিখেছেন ,উনি এই সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং যুগ সম্পর্কে জানতেন না, জানা সম্ভব ও নয়।তাই এ যুগের যে মানসিক দ্বন্দ্ব বা প্রতিঘাত , ভবিষৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার দায় একটা এ যুগের কবিদের থেকেই যায়। জানি এটা স্থূল উপমা হলো কিন্তু পুরানো কে সাথে রেখে যুগ বদল ও মানসিকতা বদলের জন্যেই আজ আমরা হাসছি, কাঁদছি, ভালোবাসছি ও কবিতা লিখছি। খুঁজে চলেছি নতুন রূপ,নতুন রস,নতুন শব্দ। আমাদের সকলেরই বিভিন্ন পথ সম্মিলিত হয় সেই এক কাব্য ভুবনে। এ যেন অনেকটা এল-ডোরাডোর ধনসম্পদ খোঁজার আশায় ভাসানো নাবিকের নৌকো।গন্তব্যে পৌঁছুনো যাক আর নাই যাক- আমার এই পথ চলাতেই আনন্দ।



প্রকাশিত ‘দৈনিক বজ্রকন্ঠ’ ব্লগ-পত্রিকায় ৩১.১২.২০১৮(আগরতলা, ত্রিপুরা)

More to see...