June 05, 2022

জাস্ট ফ্রেন্ডস

@কমলিকা 

            মল্লিকা আর বসন্ত সেই ছোট থেকে বন্ধু, মানে বি.এফ.এফ.আসলে ওদের বন্ধুত্বের সুতো বাঁধা এক জেনারেশন আগে; দু’জনের বাবা অফিস কলিগ, ফলে একে অপরের বাসায় অবাধ যাওয়া আসা।ওরা দু’জনে ছেলে হলে, হরিহর আত্মা শব্দের ডিক্শনারি-তে মানে ওদের নাম লেখা হতো। এক স্কুল, কোচিং, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, বন্ধুমহল – তাই বন্ধুত্বটা সময়ের কাঁটা চলা সত্তেও থেকে যায় অটুট।

তবে নিউটনের চতুর্থ, না না, বিরাশি নম্বর সূত্র ধরে যথা সময়ে দু’জনের জীবনেই আসে যৌবন ও অবশ্যই প্রেম। তবে যা ভাবছেন তা কিন্তু নয়, কলেজ লাইফে ডেট বা ক্রাশ তো আসে, কিন্তু অন্যের সাথে।

-   দেখ না সন্তু, রনি আমার মেসেজের রিপ্লাই দিচ্ছে না তিন ঘণ্টা হলো।

-   এই, তোরা  মেয়েরা এত চিপকু কেন রে মলি? বেচারা তো ঘুমোতেও পারে। দেবে, দেবে, একটু সময় দে। তোর মত মালকে ছেড়ে বাবু যাবে কোথায়?

-   আবার মুখ খারাপ করছিস?বন্ধুকে কেউ মাল বলে?দেবো কাকুকে বলে?আচ্ছা করে কান মুলে দিবে?

-   ইসঃ! এলেন আমার গুরুমাতা রে, তুই স্ল্যাং বলিস না?তুই আগে এমন নালিশকুটি ছিলি না। যত দিন যাচ্ছে, ওই  ন্যাকা ন্যাকা মেয়েগুলোর মত হয়ে যাচ্ছিস, ডিসগাস্টিং।

-   সন্তু, ভালো হবে না কিন্তু। আচ্ছা, তুই কি অদ্রিজাকেও এমন খিস্তি দিয়ে কথা বলিস?

-   ধ্যাৎ, কী যে বলিস? তুই আর অদ্রিজা এক হলো?এতো চিনি ঢেলে কথা বলি, তাও পাত্তা দেয় না মাইরি!কী করি বলতো?

-   সে দেয় না দেয় না, ছাড় তো। যে মেয়ে তোকে পাত্তা দেয় না, সে মস্ত বড় বোকা।

-   থাক, সান্তনা পুরস্কার চাই না। আমি জানিরে মলি, এ যুগে দেখাটাই আসল।

-   আবার বাজে কথা বলে ছেলেটা, মোটেই তেমন কিছু নয়। এই যে আমি তোকে এত ভালবাসি, এটা কি তোর রূপ দেখে না তুই এত ভালো বলে? সবাই এক হয় না রে, একদিন ঠিক দেখবি এমন একজনকে খুঁজে পাবি তুই।

-   হুমম, সেই আশায় তো আছি, গান গেয়ে বলবো – আমি রূপে তোমায় ভোলাবো না, ভালোবাসায় ভোলাবো... 

-   ওরে আমার রবীন্দ্রনাথের নাতি, মরে যাই, মরে যাই। এই যা:, তোর সাথে কথা বলতে বলতে ভুলেই গিয়েছি যে রনির বাচ্চাটা এখনও রিপ্লাই দেয় নি। ও সিওর  নীলাঞ্জনার সাথে এখন প্রেম প্রেম খেলছে। আমার ক’দিন ধরেই মনে হচ্ছে, ডাল মে কালা হে!

-   তো তুই ঐ ক্যাবলাটাকে ধরে রেখেছিস কেন এতো যদি সন্দেহ?

-   তুই যেমন অদ্রিজাকে ধরে ঝুলে আছিস।

-   আবার? যা, আমি খেলবো না। ফোন কাটলাম, তুই অপেক্ষা কর।

এখানে একটা কথা বলে রাখা ভালো যে সন্তু মানে বসন্ত দেখতে একটু খারাপের দিকে। মুখে ব্রণ, পিচকালো, দাঁতগুলো এবড়ো খেবড়ো ও সাইজটাও ট্রিপল এক্স এল। এই চেহারার জন্যেই ও একটু লো কনফিডেন্সে ভোগে। যদিও সেই ভয় মনের মধ্যেই আটকে রেখে দেয়। বাইরে সন্তু হেব্বি স্মার্ট, ব্রাইট, ফ্রেন্ডলি। শুধু মলি জানে ওর মনের এই উইক-লিংক।

মল্লিকা বহুবার বলেছে এই সব বাজে চিন্তা মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে, কিন্তু কোথাও মনের আর্কাইভে এই ইনসিকিউরীটিগুলো থেকেই যায়। আর খোঁচা পেলেই সে আকাশে মেঘ জমে, আর বৃষ্টি পড়ে।

-   জানিস মলি, অদ্রিজা বলেছে ওর আর সৌগতের মধ্যে এফেয়ার চলছে।

-   আচ্ছা, তাই আমাকে জরুরী তলব, আমি ভাবি এই কলেজ ক্যাম্পাসে আসার পর তো দেখাই পাওয়া যায় না। ভাগ্গীস্, ক্লাস একসাথে ছিল। না হলে প্রভুর দর্শনই পেতাম না।

-   মোটেই তা নয়। যদি রোজ রোজ আমাদের দু’জনকে এমন কলেজের পর গল্প করতে দেখে, এরা আমাদের গল্প বানিয়ে ওয়ালে সেঁটে দেবে। তুই তো জানিস রেগিং পিরিওডে আমার বোঝাতে বোঝাতে জান গেছে যে তুই ও আমি স্রেফ বন্ধু, আর কিছু না। লাস্টে বললাম বোনের মত, রাখি পরায়, তারপর শান্তি। বলে আমার মত আলকাতরা তোকে কী করে পটালো, ডেমনস্ট্রেট করতে!

-   হা হা হা, বেচারা, এবার রাখি পরিয়ে দেবো না কি তবে?

-   ফালতু মটকা গরম করিস না। আমার এখন দেবদাসের মত অবস্থা, মদ খেতে ইচ্ছে করছে মাইরি।

-   খাবি? আমাকে খাওয়াবি? আমার খুব দেখতে ইচ্ছে হয় কেমন লাগে?খাওয়া না প্লিজ সন্তু, বল খাওয়াবি, বল ...

-   এ কোন পাগলের পাল্লায় পড়লাম বাবা?চুপ, ফালতু কথা না। খাওয়াই আর জেঠু আমাকে বঁটিদা দিয়ে পিস পিস করে কাটুক।

-   জানলে তো কাটবে, খাওয়া না, প্লিজ ...

-   যা তো, নিজের হোস্টেলে যা, ভাগ ...

-   এই সন্তু, তোর কি খুব কষ্ট হচ্ছে?

-   কিসের জন্যে? অদ্রিজা? ধুর! ও তো বুঝলই না কী হারালো?তাই না রে বল?

-   না হলে আবার কি?বল না সন্টাই কবে নিয়ে যাবি?বিয়ার, রাম, হুইস্কি, কোনটা বেশি ভালো খেতে?কোনটা বেশি নেশা ধরায়?

-   ধুর! যা তো, ভাগ!

কলেজের চার বছর এক পলকে যেন পার হয়ে গেল। ক্যাম্পাসে সিলেকশনে চাকরী পেয়ে দু’জনে যখন দুই আলাদা শহরে আই.টি. কোম্পানীর কম্পিউটারে মুখ গুঁজতে বাধ্য হলো, বন্ধুত্বের সেই মজবুত বাঁধনের রাসটাও একটু একটু যেন আলগা হয়ে গেলো।

নতুন চাকরীর কাজ বুঝে নেওয়ার চাপ, নতুন শহর নতুন মানুষ চেনার চাপ,আরও এমন অগুনতি চাপের মাঝে বন্ধুত্ব হয়ে রইলো কিছু চ্যাট মেসেজ ও মাসে এক আধটা ফোন বা ভিডিও কল। জীবনে  যতটাই ভাবা যায় একরকম থাকবো, জীবন হয়তো কাউকে একরকম থাকতে দেয় না।

দেখা বা কথা কম হলে বন্ধুত্বের টান কিন্তু কখনো কম হয় না। সেই টন চিরকাল মনে এক থেকে যায়। মলি ও সন্তু এখন ও ফোন করলে সেই আগের বন্ধুত্বের স্বাদটাই কিন্তু ধরা পড়ে।

-   হ্যালো মলি, কেমন আছিস?

-   এত দিনে মনে পড়লো? চলছে, তুই বল...

-   একটা কথা ছিল, আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে রে, সামনের ডিসেম্বরে ২০  তারিখ। আগের থেকে বলে রাখছি ছুটি  নিয়ে এসে পড়বি,তুই আফটার অল আমার বিয়ের ইভেন্ট ম্যানেজার।

(এক দমেই কথা শেষ করলো সন্তু)

মলি, মলি, শুনতে পারছিস?

-   হুমম, আ -আছি, হঠাৎ বিয়ে? বলিস নি তো আগে?

-   আসলে ফিক্সড না হলে কি করে বলতাম বল? বাবা মা সমানেই বলছিল সেটেল হতে,তাই বললাম দেখো মেয়ে। অনুশ্রীকে দেখে আমার ভালো লাগলো, রাজি হয়ে গেলাম।

-   আমাকে একবারও বললি না?

-   এই যে বললাম। এখনও ছয় মাস বাকি। অনুশ্রী বড় ভালো মেয়ে রে। তোরও কথা বলে ভালো লাগবে।  

-   সে তো বলতেই হবে। নম্বর দিস, ওয়াটস আপে মেসেজ করে নেব।

-   মলি, তুই রাগ করে আছিস?

-   করা টা কি অস্বাভাবিক?

-   মেয়ে এমন করে বলছে যেন না হলে আমাকে বিয়ে করত, এখন মন ভেঙে ‘চান্না মেরিয়া’ গাইবে। তোকে তো বলেছিলাম, তুই তো...

-   আমার খেয়ে দেয়ে কাজ নেই। তুই আমার ঘাড় থেকে নেমেছিস, শান্তি পেয়েছি, আর রাত দুপুরে জ্বালাবি না। এখন এক সপ্তাহ ছুটি প্ল্যান করতে হবে, কালকেই বলে রাখবো বসকে ।সন্টাইয়ের বিয়ে, টোপর মাথায় দিয়ে...

-   ধুর!তুই না... অনুকে বলবো তোকে মেসেজ করতে

-   ও হো, অনুশ্রী থেকে অনু... ছেলে পুরো ফর্মে।

-   বুঝেছি তুই এখন এভাবেই মাথা খাবি, আমি রাখছি।

আজ বসন্তের বিয়ে, মল্লিকা সত্যি ইভেন্ট ম্যানেজারের মতো সব দিকে নজর রাখছে। এখন সাত পাঁক ঘোরা হচ্ছে আর মল্লিকা চেয়ারে বসে দেখছে ও নিজের মধ্যে যেন তলিয়ে যাচ্ছে। এ সময় শুধু নিজের সাথে কথা বলতে চায় মল্লিকা ও হিসেব মিলতে চায়। যেমন সিনেমায় দেখায়, আজ ওর মনে হচ্ছে যেন দু-দু’জন মল্লিকা কথা বলছে একে অপরের কাছে।

-   কী রে?খুশি তো?

-   খুশি না হওয়ার কি আছে? ভুলে যাস না, আমি ও কে মানা করেছিলাম। ও আমাকে দু’বছর আগে যে প্রপোজ করেছিল জন্মদিনে, মনে নেই?

-   কেন থাকবে না। গিফ্টয়ের সেই গোলাপী ক্লাচের ভেতর যে কাগজ রাখা ছিল, সে কাগজ তো তুই তুলে রেখে দিয়েছিস। কী কথা শুনিয়েছিলি ফোনে চিঠি পড়ার পর!

-   কি ভুল বলেছি? আমি ওকে শুধু বন্ধু ভাবি, কাছের বন্ধু ব্যাস। ওর মতো এই বোকা বোকা ছেলে মেযেগুলোই প্রমাণ করে যে একটা ছেলে আর মেয়ে কখনো বন্ধু হয় না, দু’জনের মধ্যে একজন এর মধ্যে প্রেম ঢুকিয়ে পুরোটা নষ্ট করে দেবে।

-   আর তোর মতো যারা তারা কি প্রমাণ করে? তুই বুকে হাত রেখে বলতে পারবি যে তুই কখনও বন্ধুত্বের লাইন ক্রস করিস নি? তুই স্বপ্নে দেখিস নি দুজনকে কাছাকাছি, ঘনিষ্ট ভাবে...

-   চুপ!দেখেছি ও তারপর ঘুম ভেঙে গেছে...

-   জানি, এবং কেন তা ও জানি, স্বপ্নে ওর মুখটা সামনে এলেই তোর মোহভঙ্গ হয়।

-   সত্যি তাই, আমার কেন এমন হতো জানি না। শুধু মনে হয়েছে বিয়ের ফটোশুটে একসাথে কি বাজে লাগবে, ইনস্টাগ্রাম ফিড পুরো নষ্ট, আমার এক্সরা হাসা-হাসি করবে, কেন এমন মনে হতো জানি না, কিন্তু হয়েছে, এবং তাই নিজেকে নিচু মনে হয়েছে...

-   অথচ, তুই চিরজীবন ওকে বোঝালি যে রূপে কিছুই হয় না, আসল গুণ। সেই তুই কিন্তু দর্শনধারী থাকলি, কি প্রচন্ড মেকি!

-   জানি আমাকে খুব খারাপ মনে হচ্ছে। এই দু’বছর আমি অনেক ভেবেছি, কেন রাজি হলাম না, কিন্তু হেরে গেলাম। ওর প্রতি ভালোবাসটা যে সত্যি আমি জানি, এত বছর পুরোটাই কি শুধু নাটক?

কোল থেকে টুপ করে গোলাপী রঙের ক্লাচটি মাটিতে পড়তেই মলি যেন হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো থেকে এক লমহায় এসে দাড়ালো বিয়ের আসরে। সাতপাঁক ঘোরা শেষ। সিঁদুর দান পর্ব চলছে, ক্যামেরার ঝলকানিতে ভরে পড়েছে গোটা রুম। অনুশ্রীকে কি সুন্দর দেখাচ্ছে, মল্লিকাকে কি এতটাই সুন্দর লাগতো?


 প্রবাহ পত্রিকার ডিসেম্বর ২০২১ সংখ্যায় প্রকাশিত (হাইলাকান্দি, অসম) । 

March 17, 2022

গ,ল, ও একটা প

 


-   না না রথীদা , একদম মানা  আজ শুনবই না, তুমি তো জানো আমি কী প্রচন্ড জেদি।

-   আরে সমীর ,আচ্ছা মুশকিলে ফেলেছো,আমার থেকে কতো সিনিয়র লেখক রয়েছেন ? কী করতে কী হবে,তোমার মুখ লুকানোর জায়গা থাকবেনা তখন।

-   আমার মুখের দায়ভার আমার রথীদা,তুমি শুধু তোমার মুখমন্ডল আমার পেজে দেখাও একটিবার । আরে, তুমি হলে আমাদের এই ক্ষুদ্র লেখা-লেখির  গ্যালাক্সির উজ্জ্বল সুপার নোভা। এই সময়ের অসমের একটা সাহিত্য আসর হয় বলো যেখানে তোমার লেখার কথা ওঠে না? তুমি ছাড়া আমার এই অনলাইন লাইভ প্রোগ্রাম কে শুভারম্ভ  করবে? আমি এড দিয়ে দিয়েছি অলরেডি,কতো লাইক আর কমেন্টের বন্যা কি বলবো !

-   সুপার নোভা? জানো তো সুপার নোভা কেন এত উজ্জ্বল হয়? ফেটে মৃত্যুর অটল আঁধারে ডুববে বলে,অনেকটা পিদিমের তেল বিহীন সলতে। তা যখন বলেই ফেলেছো,তোমাকে আর বিপদে কি করে ফেলি?তবে বলিয়া ফেলো সখা কী মোর  করণীয়? কোন রাজদন্ড ভাবিয়া রাখিয়াছ ?

-   ধুস, অতো কিছু না। তুমি লাইভ আসবে, আড্ডা ছলে গল্প নিয়ে দু চার কথা,কেউ প্রশ্ন করলে উত্তর এবং অবশ্যই এই লক-ডাউন সম্পর্কিত কোন ছোট বা মাঝারী গল্প পাঠ। আসলে আমরা এই প্রোগ্রামের মাধ্যমে লোকেদের বোঝাতে চাইছি ঘরে থেকেও মনকে কতটা ক্রিয়েটিভ রাখা যায়।

-   আমার আর ঘরে থাকা, জানো তো ব্যাংকের কর্মীর কী লক-ডাউন? প্রতি একদিন অন্তর যাচ্ছি। এখন মনে হচ্ছে বড় ব্রাঞ্চে থাকলে ভাল হতো ,দু দিন করে ছুটি পাওয়া যেতো।

-   ও তুমি কলম ছুঁলেই লেখা। তবে দেখা হবে। আজ রাত ৯ টায় , অপেক্ষায় থাকবো।

 

            সকালের কথাগুলো আবার মনে পড়লো রথীজিতের। সমীর বরাবর এমন খামখেয়ালী, অথচ ছেলেটার এমন অদ্ভুত মায়া মানা করা যায় না। কিন্তু সমীর কে বলা হয়নি এই লক-ডাউনে সাহিত্যিক রথীজিৎ মুখার্জী কোনো করোনা নিয়ে লেখা লেখে নি। সে এ কয়দিন ডুব দিয়েছে তার ছোটবেলার স্মৃতি, সেই আধ শহুরে গ্রামে। রথী বরাবর এই সিক্রেসি মেন্টেন করে, শেষ হওয়ার আগে কাউকে কিচ্ছুটি জানানো চলবে না। আজ একখানা গল্প লিখতেই হবে রাত ৯টার আগে, সকলকে তাক  লাগিয়ে দেওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করা যায়?

 

            রথী এই অল্প বয়সে নামযশ আসলে প্রচন্ড উপভোগ করে। সমীর আগেই বলেছিল একটা ফেসবুক লাইভ করবে, জানতো ওর ডাক আসবে,কিন্তু একেবারে ওপেনিংএ ডাকা বাড়াবাড়ি করে ফেললো । অবশ্য, এখন মুখ দেখলে যে কেউ পড়ে ফেলবে যে এই বাড়াবাড়ি রথীর কাছে কতটা সুখকর। লক-ডাউন নিয়ে একটা হট কেক বেইক করা কি মুখের কথা ? দু একজন টাইপ করে নিজের পেজে দেবে, তারপর কতো কতো শেয়ার, বাচিক শিল্পীরা  রেকর্ড করবেন ,কেউ কেউ ফটো জুড়বেন ইন্টারনেট থেকে, লাইক আর কমমেন্টস ভীড় করে আসবে স্ক্রীনে ।

 

বেশ মাখো মাখো একটা প্রেমের গল্প লিখে ফেলা যাক? স্বামী স্ত্রী অনেক দিন পর কাছাকাছি বহুক্ষণ , টান মনের, টান শরীরের।  বিছানায় অনেক দিন পর চেনা সুবাস,একটু অগোছালো ঘর,রান্নাঘরে দু এক ব্যঞ্জন কম। স্বামীর ফোনে পরকীয়া রিংটোনে আজ শুধুই মিসডকল।

 

না। মোটেই জমবে না, তার উপর সর্বাণী যদি বুঝে যায়,তাহলে আরেক ঝামেলা। কাগজ ছিঁড়ে, ডাস্টবিনে তাক করে,  কেরামের গুটি পকেটে মারার শট দিল রথী।

 

তার চাইতে বিচ্ছেদ ভালো । কতো দিন দেখিনি ভালোবাসা তোমায় , শুধু ইন্দ্রজালের সবুজ আলো বলে তুমি আছো,কাছেই আছো। তোমার ঠোঁট আজকাল প্রায়েই স্বপ্নে ভেসে আসে। শুধু ঠোঁট দুটো- নরম, গোলাপী,হালকা নড়ছে । আমি প্রাণপনে চিৎকার করে বলি,- ঐ দুটো ঠোঁট আমার অতি পরিচিত,কতো শ্রাবণ বসন্তে শুষেছি সব ঘাম, প্রেমের বৃষ্টিবিন্দু। অথচ ওরা কথা বোঝে না, শুধু প্রমাণপত্র চায়, তুমি কি আমাকে সীলমোহর দিবে?

 

আজ এই সব কি লিখছে? মনে হচ্ছে কেউ যেন চেলেঞ্জ করেছে ঐ ১০ শব্দ বা ২০, ৫০ ,যাকিছু। এরপর এখন আরো কয়েকজনকে ট্যাগানোর পালা। এভাবে লিখতে আর কাটতে থাকলে এই লেটার প্যাড একটি গল্পেই অক্কা পাবে। আসলে গল্প লেখার থেকে মুনশিয়ানা হলো টপিক। আজকাল সোশাল নেটওয়ার্কিং এ এতো  এতো লেখা, এত এত টপিক। আলাদা নাহলে লোকে দুটো লাইন পড়েই হওয়া। তবে যাবার আগে,লাইকের মহিমা ঘোষণায় ভুল হয় না। রথী যুদ্ধ জয়ের আশায় মন প্রস্তুত করে ফেলেছে। দুঃখের গল্প লেখা হবে,পাঠক এই পারফর্মিং আর্ট বা লিটারেচারে দুঃখটা খায় ভাল। এটা ভাবার সাথেই হঠাৎ ওসব রিয়্যালিটি শো নামক চলা অত্যাচারে সাজানো মেকি কান্না ও তার তরতর করে বেড়ে যাওয়া টিআরপি মনে এলো রথীর, মুখে এলো বাঁকা চাঁদের হাসি।

 

            এ কয়দিন ফেসবুকে বেশ কিছু ফটো চোখে পড়েছে, একটা দুটো বাস আর ভিড় করে আসা  শ্রমিকদল, ঠান্ডা পড়লে পরিযায়ী পাখির এভাবেই দেখা মেলে দীপরবিল জুড়ে। ফেভিকল কোম্পানী বহুযুগ আগেই এই চিত্র নিয়ে এড বানিয়েছিল । এই বাস কিছু সৌভাগ্যবান কে বুকে পুড়ে পারি  দেয়  যথা সময়,বাকি অকুল সমুদ্রে। হয় সাঁতরে পার হতে হবে, নাহলে গলায় কলসী বাঁধার রশি তৈরি করতে হবে। অবাক করে দিয়ে এই সব মাটি মানুষের দল এক হাত দিয়ে সাঁতার কাটে,এক হাতে দড়ি বানায়। আমরা সকলে মিলে গ্রেট ইন্ডিয়ান সার্কাস উপভোগ করি,পপকর্ণ সহযোগে।

-   বাবু একডা কথা আসিলো

যাঃ ,সবে শুরু হলো লেখা আর বাধা। এই বাধায় আজ জড়াবে না বলেই রথীর জোর করে কাস্টমার  গ্রিভেন্সে বসা। কাস্টমারপ্রায় নেই বললেই চলে,গ্রিভেন্স আসবে কোথা থেকে?

-   কি?হইসে কি?

এক সুর মিলিয়ে মুখে ২ কেজি উচ্ছের রস ঢেলে জিজ্ঞেস করল রথী।

-   বাবু ৫০০ টেকা পাইসি।

-   তো নাচো ,আমি কি করবো ?

-   না, মানে, ওই  খাতাটা আসলে মায়ের নামে। আমি রতন মণ্ডল,মা সরলা মণ্ডল। বাবু, ওই খাসায় (খাঁচায়) বওয়া বাবুয়ে কয় মা সাপ (ছাপ ) মারলে টেকা দিব ।

-   তো টাকা তোর মা পেয়েছে,তো তোকে দিতে যাবে কোন দুঃখে ? খালি মায়ের টাকা মেরে মাল খাওয়ার মতলব।

-   না বাবু না, মা বুড়া হইসে। আমি এতো দূর হাইট্টা আইসি, মা কেমনে আইবো কন ?ঘরে খাবার নাই ,বাইরে কাম নাই। ওই  টেকাটা  দিয়া দেন না বাবু ।

-   আমার মুখে কি লেখা বোকা বলে? ঐ টাকা ঐখানেই থাকবে রে,উড়ে যাবে না। যা,কাল মাকে নিয়ে আসবি। ব্যাংকের একটা নিয়ম থাকে তো না কি?

রতন মাথা নিচু করে চলে গেলো। রতনের চলে যাওয়া ছায়াশরীরের দিকে তাকিয়ে রথী মনে মনে ভাবলো এটা গল্প হলে, আর ও নায়ক হলে নিশ্চয়ই নিজের পকেট থেকে ১০০ টাকা দিয়ে বলত, “যাও, কাল মাকে কিছু ভাড়া করে নিয়ে এসো।”

যাক আমাদের দুঃখের  গল্প যেন কোথায় ছিল? হা , শ্রমিকেরা শুরু করল পদযাত্রা। আমাদের গল্পের নায়ক ও তাদের একজন ,নাম কি দেওয়া যায়? রতন মণ্ডল? আচ্ছা সেটাই থাক। না একটা মদ্দা  ছেলে হলে শুধু জমবে না, ওর পরিবারও সাথে চলছে হেঁটে, বউ ও দুটো কচি বাচ্চা,বয়স যা কিছু একটা,কে আর হিসেব রাখছে। রথী মনে মনে সিচুয়েশন কল্পনা করলো। এ কয়দিন ইন্টারনেট ভাসিয়ে দেওয়া কত কত ছবি চোখের সামনে ভাসছে এক এর পর এক। একটা ছবি খুব তোলপাড় করেছিল রথীর মন,ফাটা চার জোড়া পায়ের ছবি, পা ফেটে চামড়া খুলে খুলে পড়ছে। পরে কেউ লিখলো  ওই ছবি এ সময়ের না, পাকিস্তানের। শুনে মনে এক স্বস্তি এসেছিল। স্বস্তি কি পাকিস্তানের,ভারতের নয় বলে? ভারতের এই মজুরদের পায়ের ছবি কোন ক্যামেরাম্যান কি তুলেছে?কেমন পা ওদের? অন্যরকম কিছু?

-   বাবু, একটা কথা জিগানের আসিল?

সবে দুঃখগুলো গ্রে-সেলে  আঘাত দিচ্ছিলো ,আবার বাধা পড়লরথী বিরক্তি সহকারে তাকালো, এক মধ্য বয়স্ক লোক, অনাহারে হয়তো একটু বেশি বুড়িয়ে গেছে মনে হলো, অবশ্য নেশার জেরেও হতেই পারে

-   বাবু, সরকারে বলে গরীব মাইনসেরে ৫০০ টেকা  দিতেসে?

-   হুমম ,তোমার পাসবুক,  মানে ঐ খাতা নিয়ে যাও ঐ ৪ নম্বর কাউন্টারে ,দিয়ে দেবে

-   গেসিলম বাবু, কইলো কি সব একান্ট ফেকান্ট  লাগবো? কই  পায়?

-   বলি কোন জগতে থাকো ?ব্যাংক একাউন্ট যখন বানলো সরকার,ঘুমিয়ে ছিলে ?

-   জানি না বাবু,আমরা তো ঐ ইস্টিশনের পাশে খালি জায়গায় থাকি। ঐখানে কিছু বানাইসিলো নি?চক্ষে তো পরে নাই?

-   গবেট একটা। যাও এইখানে কিছু হবে না। ঐ ৫০০ টাকা সবাই পায় না,তোমার নাম ও নাই, যাও। যাও বলছি ।

লোকটা কি বুঝল বোঝা গেল না, আধময়লা গেঞ্জি দিয়ে চোখ মুছলো কি একবার? হয়তো তাই। রথী বুঝল মেজাজ ঘেটে ঘ।   কেন যে সরকার এসব ঘোষণা করে? আজকাল এই লক-ডাউনে এই হয়েছে কাজ। জনে জনে আসে, একবার দেখবে ৫০০ আছে, একবার তুলবে, একবার বইয়ে লেখবে। মনে হচ্ছে ৫০০ না যেন পঞ্চাশ হাজার।  

না, এসব ফালতু কাজে অনেক মাথা ঘামিয়েছে রথী, সময় নষ্ট অনেক ।ওকে এবার ওর কালজয়ী গল্পে ঢুকে পড়তেই হবে। সকলে শুনবে আর চোখে আসবে জল। রাবীন্দ্রীক কায়দায় বলবে- হায় রে বিধাতার শক্তির অপব্যয় ।

-   হই দিনু ,এক কাপ চা দিয়ে যা,গল্প জমে উঠেছে।


উজান অতিমারি সংখ্যা (সপ্তদশ সংখ্যা ১৪২৮ ), তিনসুকিয়া, অসম এ প্রকাশিত (ডিসেম্বর,২০২১ ) 

May 21, 2020

আঁচল



-        কী আর করবো? রোজ অংক কষছি আর ভিডিও বানাচ্ছি । এভাবে অনলাইন কি আর পড়ানো যায়? ...
           আরে বাবা পিপিটিও বানিয়েছি। ভাল্লাগেনা এই জ্বালা।...   
আজই তো আরও দু’সপ্তাহ বাড়িয়ে দিলো । এই সেশন এভাবেই যাবে দেখবি।...   
আসলে ভাবছে টিচারদের কেন বেকার টাকা দেবো, একটু খাটিয়ে মারবো না? ...   
চল রাখছি, এখন তো আবার পচার মা মোড অন। মার ঝাড়ু মার ঝাড়ু মেরে ঝেটিয়ে বিদায় কর... 
         
@কমলিকা 
বৌমার টুকরো টুকরো কথাগুলো কানে আসছে সুধাময়ীর। কথাটা অবশ্য মিথ্যে বলেনি। এই গৃহবন্দিনী হওয়ার পর থেকে প্রভা নিজেই ঝাড় -পোঁচ চালাচ্ছে, আর উনি নিয়েছেন রান্নাঘরের দায়ভার। আসলে রাঁধতে সুধা বরাবর ভালোবাসেন। তবে ক'বছর আগে শুভ জোর করলো- মায়ের বয়স বেড়েছে,আর কেন গরমে তেতে পুড়ে সিদ্ধ হওয়া? এরপর ঘরে কুক এলো,ব্যস সুধার হাতে রিটায়ারমেন্ট লেটার। তাছাড়া কুক চাইনিজ, কন্টিনেন্টাল,মেক্সিকান,কত কি জানে? আর সুধা, সেই তো থোড়-বড়ি-খাড়া  আর খাড়া-বড়ি-থোড়। ওসব সেকেলে খাবার গেস্টদের খাওয়ালে কী প্রেস্টিজ থাকে?

এই লক-ডাউনে ঠিক কতজন জ্বালাময় জীবন পেয়েছে সুধা জানেন  না, কিন্তু সে নিজে তুখোড় ভাবে উপভোগ করছেন। শুধু খুশিটা বাইরে প্রকাশ করেন না- এই যা। রোজ সকালে রামকৃষ্ণ দেবের ছবিতে একবার বলেও ফেলছেন, - ঠাকুর রোগ ঠিক করে দাও তবে পারলে এই লক-ডাউন আরও কিছু দিন রেখো,সকলেরই তো একটু ছুটির দরকার।

খুশি হবেন নাই বা কেন? সেই কলেজে পড়ার পর শুভটা আর কখনো এতদিন ঘরে রয়েছে? ছেলে,বৌমা,নাতি সব এখন ঘরে,তাঁর কাছে, এর থেকে আনন্দ আর কি কিছুতে থাকতে পারে? রোজ মনের মতো যা নিরামিষ পদ বানাচ্ছেন , সকলে সোনামুখ  করে খাচ্ছে। টুকাইটা তো কাল জিজ্ঞেস করেই ফেললো ঝিঙে-পোস্ত খেয়ে, - ঠাম ,এই হোয়াইট বলসগুলো কি কোনো ভেজিটেবল?

শুভ মানে শুভপ্রসন্ন  চ্যাটার্জী বিশাল আইটি কোম্পানীর এগজিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার। নামেই  ঘরে আছে, সকাল থেকে রাত কাপের পর কাপ ব্ল্যাক কফি ও ল্যাপটপে মুখ গোঁজা,কানে হেডফোন। জীবনের সেনটেন্সে শুধু লাঞ্চ ,ডিনার,স্নান, ঘুম, ও ব্রেক, এই পাঁচটে অল্পবিরাম,যাকে বলে কমা, সাজানো। স্ত্রী ইন্দুপ্রভা এক ডাকসাইটে স্কুলের  ম্যাথস টীচার। দিন কাটছে অনলাইন ক্লাস ও ইউটিউব, ফেসবুক করে, মাঝে মাঝে দু একটা ভিডিও কল। ছেলে সূর্যপ্রভ মানে টুকাইয়ের বয়স সবে পাঁচ। তার বিশেষ কাজ নেই। কিন্তু বাপী-মামকে শান্তিতে কাজ করতে দেওয়ার জন্যে তাকেও দেওয়া হয়েছে একটা ট্যাব । কার্টুন,গেমস্ ,রাইমস্ ,কি নেই এইটুকুন বাক্সে ? সুধাময়ী দেখেন আর ভাবেন কম্পিউটার চালানো শিখে ফেললে বেশ হত ,উনিও তাদের একজন হয়ে উঠতে পারতেন। স্ক্রিন টাচ মোবাইল বৌমা শিখিয়ে দিয়েছে সত্যি, কিন্তু ছুঁলেই কেন যে ভয় পেয়ে বসে -অত দামী জিনিস, যদি কিছু হয়।

তার চাইতে টিভি ভাল,ঐ বাংলা সিরিয়ালগুলো ভাল। তবে এই একটা জিনিস সুধার একেবারেই ভাল লাগছে না। আজকাল একটা সিরিয়ালও নতুন এপিসোড দেখায় না। সব পুরোনো শেষ হওয়া সিরিয়ালের রেকর্ডিং ক্যাসেটে ধুলো ঝাড়ছে আর চালাচ্ছে। কিন্তু তবুও কিছু পাওয়ার জন্যে কিছু ছাড়া যেতেই পারে। নাহয় তিন তিনটে মুখ যখন ইচ্ছে দেখার জন্যে সুধা ঐ সিরিয়ালগুলোর মায়া ত্যাগ করলেন।

টিং-টং ,টিং-টং

-        এই দুপুরবেলা আবার কে এলো?ভাবলাম একটু রেস্ট নেই, এখন কনফারেন্স নেই, কার  সাধ্য ? আসছি রে বাবা আসছি। মা তুমি কিন্তু আবার দরজা খুলতে চলে যেও না।

সুধার এই কথাতে প্রথম প্রথম একটু মানে লাগতো, এখন গা  সওয়া হয়ে গেছে। এই রোগে বৃদ্ধেরা  না কি বেশি রিস্কে ,তাই আজকাল সুধার দরজা খোলা মানা। যেন সেই ষাটের দশকের ঘর,শুধু জওয়ান পুরুষ দরজা খুলবে,বাকি সব অন্দরে। সুধার মাঝে মাঝে মনে হয় শুভকে বলতে, ওনার আর শুভর ইমিউনিটি টেস্ট হলে উনি জিতবেন,নিশ্চিত। শুভই দু দিন অন্তর হয় জ্বর, নাহলে মাথাব্যাথা, না হলে অন্য কিছু নিয়ে কাড়িকাড়ি ওষুধ গেলে।

-        কে , কী চাই?
-        দাদা, আমি কালু, একটু দরজা খুলেন না,কাম আসিলো।
শুভ দরজা খুললো বটে কিন্তু ল্যাচটা রইলো যথাস্থানে, বলা তো যায় না।
-        কালু মানে, ঐ পাড়ার হরি মুদির দোকানের কালু? তোকে তো চিনতেই পারিনি আমি। এরকম টেরোরিষ্টের মতো পুরো আপাদমস্তক ঢেকে এসেছিস যে। বৌদি বা মাসি কি ফোনে কিছু আনতে বলছিল ?
-        (একটু লজ্জা পেল মনে হলো) কী করুম কন দাদা?সবে কয় মাস্ক পর,কই কই ঘুরস,আমাদের ঘরে এরপর তুই অসুখ ঢুকাবি দেখতেসি। দাদা, একটু মাসিমারে ডাইক্কা দেন না।
-        কেন? আমাকে বল, কী  কাজ?
-        না দাদা, মাসিমারে ডাকেন, একটু দেইকখা যামু গিয়া, দূরে থাকুম বিশ্বাস করেন।

শুভ মনে মনে বেশ বিরক্ত হলো। ইচ্ছে করছে মানা করে দিতে,কিন্তু ওদের এখন হাতেও  রাখতে হবে। ওসব মল, অনলাইন ডেলিভারী সব বন্ধ, এখন এই কালু না করলে শেষ মেশ শুভকেই চলের বস্তা  বইতে হবে। নিশ্চয়ই টাকা চাই। ঠিক বুঝেছে ছোঁড়া যে শুভ অতো সহজে গলবে না,তাই মায়ের খোঁজ। মায়ের  এই বোকা বোকা ভালমানুষী শুভর জাস্ট সহ্য হয় না। গরীব শুনলেই হয়ে গেল, পারলে কোলে বসিয়ে ভাত খাওয়াবে। বোঝানোই যায় না এগুলো এখন অচল, লোকে ফায়দা লুটে, যেমন এখন এই কালু এসেছে। মাকে আচ্ছা করে বলে দিতে হবে ৫০ টাকার বেশি যেন না দেয়। সরকার সব তো দিচ্ছে, এদের স্বভাবটাই হচ্ছে পরের মাগনা  খাওয়া।

-        কি রে কালু,আমার খোঁজ করছিলি ? তুই তো মাসি কে ভুলেই গেছিস, দরজা থেকেই চলে যাস আজকাল।
-        না মাসিমা, সবে কয় বুড়াগো সমলাইয়া থাকতে, তাই ডাকি না। আপনে ভাল থাকেন,  এইটাই তো চাই কন।
-        তা ডাকছিলি কেন সেটা তো বললি না এখনো। কী হয়েছে,হাতে টাকা নাই ? খেয়েছিস কিছু আজকে?
-        না না মাসিমা, আপনেরে দেখতে মন বড় টানতেসিলো, তাই আইলাম। এখন দেখসি , যাই গিয়া।
-        মানে? আমাকে দেখতে? বুঝলাম না। সত্যি বল তো কালু কি হয়েছে।
-        মাসিমা, আপনেরে মিসা কমুনা । আপনেরে কইসিলাম  না গ্রামে আমার মা একলা থাকে, আর আমি এইখানে। মারে আমি এক দিন বাদ দিয়া পরের দিন দুপুর বারোটায় সঞ্জয়দার দুকানে ফোন করতাম। সঞ্জয়দার আমাগো পাড়ায় জামা-কাপড়ের দুকান, অনেক বড়লোক। আমি সঞ্জয়দারে রাজি করসিলাম যে আমি ফোন করুম, মারে একটু কথা কইতে দিব, মাসে ৫০ টেকা দিমু। এখন ২১ দিন ধইরা দুকানও  খুলে না, মায়ে  ফোনও ধরে না। মারে খুব মনে পরতেসিলো। মনে হইলো আপনেরে দেইখা যাই। আপনে যখন ভাল আসেন, মা ও ভালই থাকবো, তাই না কন?

এখন প্রায়ে রাত ১১টা। সুধাময়ীর চোখে ঘুম নেই। দরজা বন্ধ করে যখন আড়ি পাতা শুভকে বলেছিলেন টাকা লাগবেনা,তখন কি তাঁর গলা কাঁপছিল? শুভ তো তার সুযোগ্য ছেলে,সবে তাঁকে রত্নগর্ভা বলে, তবে কেন আজ হিংসে হলো মনে? মায়ের মনে কি আদৌ হিংসে হয়? কি সব ভাবছেন  আকাশ পাতাল আজ। সব ঐ হতচ্ছাড়া সিরিয়ালগুলোর জন্যে। বেশ টাইম পাস হত, এখন সারাটা সন্ধে আলসেমিতে কাটে আর রাতে ঘুম হাওয়া। হাত জোর করে বিড়বিড় করলেন সুধাময়ী – ঠাকুর, সিরিয়ালগুলো শুরু করিয়ে দাও যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, লক-ডাউন উঠিয়েই দাও, খুব বাজে কাটছে দিনগুলো।



ফেসবুকে পোস্ট ০৩.০৫.২০২০ । 

More to see...